তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কি শুরু হয়ে গেছে?
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছে কিনা, এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল প্রশ্ন। এর উত্তর দেওয়া সহজ নয়, কারণ “বিশ্বযুদ্ধ” শব্দটির কোনো সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত সংজ্ঞা নেই। ঐতিহাসিকভাবে, দুটি বিশ্বযুদ্ধ এমন সংঘাত ছিল যা বিশ্বের অধিকাংশ প্রধান শক্তিকে বিভিন্ন জোটের অধীনে একে অপরের বিরুদ্ধে টেনে এনেছিল এবং যার প্রভাব বিশ্বব্যাপী অনুভূত হয়েছিল।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে, বিশ্বজুড়ে বেশ কিছু উত্তেজনা ও সংঘাত বিদ্যমান, যা অনেকের মনে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা জাগিয়েছে। তবে, এই পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণরূপে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হিসেবে আখ্যা দেওয়া যায় কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এই প্রবন্ধে আমরা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধারণার প্রেক্ষাপট:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিশ্ব একটি দ্বি-মেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় বিভক্ত ছিল – একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেশ, এবং অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার মিত্রদেশ। এই সময়কালে সরাসরি কোনো বড় ধরনের যুদ্ধ না হলেও, স্নায়ুযুদ্ধ (Cold War) নামে পরিচিত একটি দীর্ঘমেয়াদী ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বজায় ছিল। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্ব এককেন্দ্রিক ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকেছিল, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি প্রধান শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছিল।
তবে, গত কয়েক দশকে এই পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এসেছে। চীনের উত্থান, রাশিয়ার পুনরুত্থান, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিল সমীকরণ নতুন করে ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি করেছে। বর্তমানে, বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক সংঘাত চলছে এবং প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রেক্ষাপটেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর পক্ষে কিছু যুক্তি:
অনেকের মতে, বর্তমান বিশ্বের পরিস্থিতি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে, তার কিছু কারণ নিচে উল্লেখ করা হলো:
- একাধিক আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার: বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধ, ইসরায়েল-হামাস সংঘাত, ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ, সুদানের সংঘাত এবং অন্যান্য বিভিন্ন অঞ্চলে ছোট-বড় আকারের যুদ্ধ ও অস্থিরতা বিরাজ করছে। এই সংঘাতগুলোতে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। অনেকের আশঙ্কা, এই আঞ্চলিক সংঘাতগুলো বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে সরাসরি সংঘাতের সূত্রপাত ঘটাতে পারে।
- প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক্রমশ বাড়ছে। তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন সাগর, ইউক্রেন এবং অন্যান্য ইস্যুতে এই দেশগুলোর মধ্যে তীব্র উত্তেজনা দেখা যায়। অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তিগত আধিপত্য এবং প্রভাব বিস্তারের লড়াই এই উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। এই দেশগুলোর মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি এখনো কম থাকলেও, ভুল বোঝাবুঝি বা অপ্রত্যাশিত ঘটনার কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
- আন্তর্জাতিক আইনের দুর্বলতা ও বহুপাক্ষিকতাবাদের অভাব: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা তৈরি করা হয়েছিল। তবে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং বহুপাক্ষিকতাবাদের প্রতি অনেক দেশের অনীহা দেখা যাচ্ছে। এর ফলে, কোনো একটি বড় সংঘাত শুরু হলে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
- প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও নতুন অস্ত্রের বিস্তার: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার যুদ্ধ, মহাকাশভিত্তিক সামরিক প্রযুক্তি এবং অন্যান্য অত্যাধুনিক অস্ত্রের বিস্তার যুদ্ধের প্রকৃতিকে পরিবর্তন করে দিয়েছে। এই নতুন প্রযুক্তিগুলো ব্যবহারের ফলে সংঘাতের তীব্রতা ও ধ্বংসলীলা অনেক গুণ বেড়ে যেতে পারে। সাইবার হামলা একটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে অচল করে দিতে পারে এবং এর ফলে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় ঘটতে পারে।
- অর্থনৈতিক সংকট ও সম্পদের প্রতিযোগিতা: বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের (যেমন – খনিজ তেল, গ্যাস, পানি) জন্য প্রতিযোগিতা বিভিন্ন দেশের মধ্যে সংঘাতের জন্ম দিতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব খাদ্য ও পানির অভাবকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে, যা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে।
- তথ্যযুদ্ধ ও অপপ্রচারের বিস্তার: ইন্টারনেট ও সামাজিক মাধ্যমের যুগে তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ভুল তথ্য, বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণা এবং অপপ্রচার জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে অবিশ্বাস ও শত্রুতা বাড়াতে পারে। এর ফলে, কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের পথ কঠিন হয়ে পড়ে।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু না হওয়ার পক্ষে কিছু যুক্তি:
অন্যদিকে, এমন অনেক কারণও রয়েছে যা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার সম্ভাবনাকে কমিয়ে আনে:
- প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে সরাসরি সংঘাতের অভাব: যদিও বিভিন্ন অঞ্চলে উত্তেজনা রয়েছে, তবে এখনো পর্যন্ত বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে সরাসরি কোনো সামরিক সংঘাত ঘটেনি। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া সরাসরি জড়িত থাকলেও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি।
- পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিরোধ: পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার একটি বড় ধরনের যুদ্ধের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করে। “পারস্পরিক নিশ্চিত ধ্বংস” (Mutually Assured Destruction – MAD) তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো পারমাণবিক শক্তি অন্য কোনো পারমাণবিক শক্তির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক হামলা চালালে, উভয় পক্ষই ধ্বংস হয়ে যাবে। এই ভয়াবহ পরিণতি একটি বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হওয়া থেকে বিরত রাখে।
- অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরশীলতা: বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি একে অপরের সাথে গভীরভাবে জড়িত। বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের মাধ্যমে দেশগুলো একে অপরের উপর নির্ভরশীল। একটি বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হলে বিশ্ব অর্থনীতি ভেঙে পড়বে এবং সকল দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরশীলতা একটি বড় যুদ্ধের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী বাধা হিসেবে কাজ করে।
- কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা: যদিও আন্তর্জাতিক আইনের দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, তবুও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা (যেমন – জাতিসংঘ) এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখনো চলমান রয়েছে। বিভিন্ন দেশের মধ্যে আলোচনা ও মধ্যস্থতার মাধ্যমে সংঘাত এড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
- জনমতের চাপ: বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষ যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন। যুদ্ধবিরোধী জনমত এবং শান্তির আকাঙ্ক্ষা সরকারগুলোর উপর একটি বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে, যা তাদের যুদ্ধ শুরু করার আগে বহুবার ভাবতে বাধ্য করে।
- আঞ্চলিক সংঘাতের সীমাবদ্ধতা: যদিও বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত চলছে, তবে সেগুলো এখনো পর্যন্ত আঞ্চলিক পরিসরেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। কোনো একটি সংঘাত এখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্বের অন্যান্য প্রধান শক্তিকে সরাসরি টেনে আনবে।
বর্তমান পরিস্থিতি কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বাভাস?
বর্তমান বিশ্বের পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। একাধিক আঞ্চলিক সংঘাত, প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিল সমীকরণ একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করেছে। তবে, এই পরিস্থিতিকে সরাসরি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বাভাস হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বলতে এমন একটি সর্বাত্মক সংঘাতকে বোঝায় যেখানে বিশ্বের অধিকাংশ প্রধান শক্তি সরাসরি সামরিকভাবে জড়িত হবে এবং যার প্রভাব বিশ্বব্যাপী অনুভূত হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে, যদিও উত্তেজনা ও সংঘাত বিদ্যমান, তবে এখনো পর্যন্ত এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি যেখানে বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলো সরাসরি একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে।
তবে, পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হতে পারে। কোনো একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা, ভুল বোঝাবুঝি বা আঞ্চলিক সংঘাতের বড় ধরনের বিস্তার বিশ্বকে একটি নতুন এবং বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এবং কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের উপর জোর দিতে হবে।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছে কিনা, এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেওয়া কঠিন। বর্তমান বিশ্বে উত্তেজনা ও সংঘাতের বিস্তার নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক, তবে এখনো পর্যন্ত এটিকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্বযুদ্ধ হিসেবে আখ্যা দেওয়া যায় না। পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিরোধ, অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরশীলতা এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখনো একটি বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
তবে, ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভোগার কোনো সুযোগ নেই। বিশ্বনেতাদের দায়িত্বশীল আচরণ, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং কূটনৈতিক সমাধানের উপর জোর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। যেকোনো ভুল পদক্ষেপ বা উত্তেজনা বৃদ্ধি বিশ্বকে একটি ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই, শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য সকল পক্ষকে সম্মিলিতভাবে কাজ করে যেতে হবে।

